মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ৮ August ২০১৬

বাংলাদেশে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান

 

 প্রেক্ষাপটঃ

 

*  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দেশের দরিদ্র মানুষের দরিদ্রতা দূরীকরণের জন্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিসংস্থা (এফও) কর্তৃক ১৯৭২ সালে এশিয়া অঞ্চলের কতিপয় দেশে ক্ষুদ্র কৃষক ও ভূমিহীনদের অবস্থা পর্যবেক্ষন করে তাদের উন্নয়নে সুপারিশমালা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে “Asian Survey on Agrarian Reforms and Rural  Development (ASARRD)'' শীর্ষক সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়;

 

*  বাংলাদেশেসহ আটটি দেশে সমীক্ষা শেষে ১৯৭৪ সালে একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়। প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষন ছিল যে, প্রচলিত উন্নয়ন ব্যবস্থায় গ্রামীণ দারিদ্র্য গণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে এবং এদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে;

 

*  প্রতিবেদনে গ্রামীণ দরিদ্রদেরকে সকলপ্রকার সেবা সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে গ্রাম পর্যায়ে দরিদ্রদের নিয়ে একটি “গ্রহণকারী ব্যবস্থা' গড়ে তোলা এবং “প্রদানকারী ব্যবস্থা'কে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করা হয়;

 

*  বাংলাদেশ সরকার এ সুপারিশের আলোকে ১৯৭৫-১৯৭৬ সালের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার এর আমলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)-এর আওতায় “Action Research on Small Farmers and Landless Labourers Development project (SFDF)'' শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়;

 

*  এ প্রকল্পটির মাধ্যমেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সরকারি খাতে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি-এর সূচনা হয় ।

 

 

*  প্রকল্পটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও বগুড়া জেলার সদর উপজেলায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ০৩ (তিন)টি প্রতিষ্ঠান যথাঃ (১) বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড), কুমিল্লা; বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বিএইউ), ময়মনসিংহ এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ) বগুড়াকে বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয়;

 

*  প্রকল্পের ১৯৭৫-৮০ সালের কার্যত্রম সন্তোষজনক বিবেচনায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ কর্তৃক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করা হয়;

 

*  পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড), কুমিল্লাকে প্রকল্পটি এককভাবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয়;

 

*  পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতায় বার্ড কতৃক পরপর চার পর্যায়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটিকে ১৯৯৯-২০০৪ পর্যায়ের মেয়াদ সমাপনান্তে ১৯৯৪ সালের কোম্পানী আইনের অধীনে “ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন' নামে একটি সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন লিমিটেড কোম্পানীতে রুপান্তর বিষয়ে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময় সিন্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সিন্ধান্ত অনুযায়ী ইং ২০০৫ এর জুলাই থেকে এই প্রকল্পটি স্থায়ী ফাউন্ডেশন হিসেবে কাজ শুরু করে।

 

*  গত শতাব্দীর সত্তর দশক নানা কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। বিশেষ করে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশসহ সেই সময় ফিলিপাইন, ভারত, নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ অনুন্নত দেশগুলো ক্ষুধা ও মন্দা কাটাতে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সংগ্রামরত ছিল। এ সব দেশে ক্ষুধা ও মঙ্গা আক্রান্ত মানুষকে কিভাবে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করা যায় সেজন্য জাতিসংঘের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ পথ খুজেঁ ফিরছিলেন।

 

*  এ প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) ১৯৭২ সালে এশিয়া অঞ্চলের ০৮ ( আট)টি দেশ যথা-বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ফিলিপাইনস, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া ও থাইল্যান্ডের ক্ষুদ্র কৃষক ও ভূমিহীনদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে তাদের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য Asian Survey On Agrarian Reforms and Rural Development (ASARRD) শীর্ষক একটি স্টাডি প্রকল্প গ্রহণ করে।

 

*  এ প্রকল্পের সংগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ফিলিপাইনস, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া ও থাইল্যান্ডের দরিদ্র মানুষের মাঝে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। জরিপ প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রচলিত উন্নয়ন ব্যবস্থায় গ্রামীণ দরিদ্র জনগণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে এবং এদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রতিবেদনে গ্রামীণ দরিদ্রদের উন্নয়নে অংশীদার করার জন্য সকলপ্রকার সেবা প্রদানের লক্ষ্যে গ্রাম পর্যায়ে দারিদ্রদের জন্য একটি ‘গ্রহণকারী ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা এবং ‘প্রদানকারী ব্যবস্থা’ কে ঢেলে সাজানোর জন্য ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এ স্টাডি প্রকল্পের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর কাছে তাদের এ সংক্রান্ত সুপারিশমালা পেশ করে।

 

*  স্টাডি প্রজেক্টে ০৮টি দেশ অংশগ্রহণ করলেও এ প্রকল্পের সুপারিশ বাস্তবায়নে সে সময় বাংলাদেশই কেবল সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- এর সরকার এ প্রকল্পের সুপারিশ অনুযায়ীই  ১৯৭৫-৭৬ সালের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় Action Research on Small Farmers and Landless Labourers Development শীর্ষক একটি প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করে।

 

*  প্রকল্পটির প্রায়োগিক গবেষণা কার্যক্রম কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও বগুড়া সদর উপজেলায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী, (বার্ড), কুমিল্লা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ময়মনসিংহ এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া-কে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

 

*  মূলত এ প্রকল্পের মাধ্যমেই শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বে সর্বপ্রথম দরিদ্র ও দরিদ্রতর মানুষকে অনানুষ্ঠানিকভাবে সংগঠিত করে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধি ও জাতীয় উন্নয়নে অংশীদার করার যুগান্তকারী কার্যক্রমের সূচনা হয়।

 

*  নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে পরবর্তীতে এ গবেষণা প্রকল্পের ইতিবাচক ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে Small Farmers and Landless Labourers Development Project নামে এবং পরে Small Farmers Development Programme (SFDP) নামে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতায় স্বল্প পরিসরের একটি প্রজেক্ট হিসেবে এর কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাবে এ প্রকল্পটি যেভাবে বিস্তৃত হবার কথা ছিল সেভাবে বিস্তৃত হয়নি। পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনার সরকারের সময়ে ১৯৯৬-৯৯ সালে প্রকল্পটির কার্যক্রম অব্যাহত রেখে ডিপিপিতে প্রকল্পটি সমাপ্তির পর স্থায়ী ফাউন্ডেশনে রূপান্তরের অনুমোদন প্রদান করা হয়। এ সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তীতে প্রকল্প সমাপ্তির পর প্রকল্পটি Small Farmers Development Foundation (SFDF) নামে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতায় ১৯৯৪ সালে কোম্পানি আইনে সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম শুরু করে।

 

*  এ দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় প্রকল্পটি কখনো পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের আওতায়, কখনো বার্ডের আওতায় একটি প্রকল্প হিসেবে কার্যক্রম সচল রাখলেও এ প্রকল্পটিকে জামানতবিহীন ঋণ কার্যক্রমের পথিকৃৎ হিসেবে যে রূপ আর্থিক বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন ছিল তা না পাওয়ায় কোনভাবে প্রকল্পটি তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিলো। কিন্তু এরপর থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রামীণ ব্যাংক, বিআরডিবি, পিডিবিএফ, পিকেএসএফ, ব্র্যাক, আশাসহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাপক মূলধন নিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে। ফলে এসএফডিএফ পথিকৃৎ সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও বিনিয়োগ মূলধনের অভাবে ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে অন্যান্যের তুলনায় সীমিত হয়ে পড়ে।

 

*  অথচ ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের জন্য যে ব্যক্তিত্ব বিশ্ব স্বীকৃতি অর্জন করেছেন, তিনিও এক সময় এ প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠ পর্যায়ে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ, অনানুষ্ঠানিক সমিতি গঠন, কিস্তি আদায় উদ্ধুদ্ধকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিদর্শন করেছেন এবং এ প্রতিষ্ঠানের সেমিনার, ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছেন। এ সব অর্জিত জ্ঞান তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করেছেন।

 

*  বিশ্বে তথা বাংলাদেশে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ কর্যক্রমের পথিকৃৎ সংগঠন হিসেবে নিঃসন্দেহে স্বীকৃতির দাবিদার এসএফডিএফ। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্য অঙ্গীকার নিয়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে যিনি এগিয়ে এসেছিলেন তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তথ্য প্রমাণ, ইতিহাস ও সময়ের নিরিখে যথাযথ ও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করলে এ জ্বাজ্বল্যমান সত্য প্রমাণিত হবে যে বাংলাদেশে তথা বিশ্বে জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের পথিকৃৎ সংগঠন ‘ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (এসএফডিএফ)’পথিকৃৎ হচ্ছেন বাংলাদেশের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর এ মহতী প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের সাথে জড়িয়ে আছে বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও), বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড), কুমিল্লা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ময়মনসিংহ এবং পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ), বগুড়া, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি।

 

*  বর্তমানে নিভু নিভু অবস্থান থেকে এসএফডিএফ কার্যক্রমের উত্তরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর এ সংগঠনের কার্যক্রম বিস্তৃত হচ্ছে। পূর্বে যেখানে এর কার্যক্রম ৫৪টি উপজেলায় ছিল বর্তমানে সেখানে ১৭৪টি উপজেলায় সম্প্রাসারিত হয়েছে। আশা করা যায় বর্তমান সরকারের দারিদ্র্য বিমোচনের অঙ্গীকার অনুযায়ী এ কার্যক্রম আরো ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করবে এবং দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে জামানতবিহীন ঋণ কার্যক্রমের পথিকৃৎ সংগঠন হিসেবে এসএফডিএফ নিজের প্রাপ্য মর্যাদা পাবে।


Share with :